বিষয়:উহুদের যুদ্ধ।

ধুলো আর রক্তে ভেসে যাচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্র। শুরুতে মুসলিমরা জয়ের পথে ছিল।

মুসলিম বাহিনী শত্রুকে ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছে।
রাসুল ﷺ ধনুর্ধর সাহাবীদের বলেছিলেন:
“এই গিরিপথ ছেড়ো না, যা-ই হোক পাহারা দেবে।”

কিন্তু যুদ্ধের অন্তিম মুহূর্তে এসে কিছু সাহাবী ভেবেছিলেন—যুদ্ধ শেষ, মুসলমানরা বিজয়ী। এখন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সংগ্রহ শুরু হবে। তাই তারা গিরিপথ ছেড়ে চলে গেলেন।

এই গিরিপথ ছেড়েই বিপর্যয় ডেকে আনে। যখন ধনুর্ধর সাহাবীরা রাসুল ﷺ–এর কঠিন নির্দেশ ভেঙে পাহাড়ি গিরিপথ ছেড়ে দেন, ঠিক তখনই যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি) ঘোড়সওয়ার বাহিনী নিয়ে পিছন দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েন। (হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ছিলেন যুদ্ধে প্রচণ্ড পারদর্শী। উনি মুসলিম হওয়ার পর কোনো যুদ্ধে হারেননি।)

মুসলিমরা তখন চারদিকে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।

শুরু হয় বিভ্রান্তি, কানের ভেতর বাজতে থাকে শত্রুর কণ্ঠ—
"মুহাম্মদ নিহত হয়েছেন!"

এই ভুয়া সংবাদে অনেকে ভেঙে পড়ে, এই কথাতেই যেন সাহাবীদের পৃথিবী থেমে গেল।
কারো হাতে তলোয়ার কাঁপছে, কারো চোখে হতাশা।
মুসলিম সেনারা ছুটছে চারদিকে, চতুর্দিক থেকে দ্রুত সাহাবী নিহত হতে থাকে।

সব দিকে হতাশা আর ভয় কুয়াশার মতো ছড়িয়ে পড়ে। ঐ সময় রাসুল ﷺ–এর চাচা মহাবীর হামযা (রা:) কে টার্গেট করে হত্যা করা হয়। এরপর আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা (মুয়াবিয়ার মা) খুশিতে দৌড়ে এসে হামযা (রা:)–এর কলিজা চাবিয়ে পৈশাচিক আনন্দ নিতে শুরু করে। কেননা হামযা (রা:) বদর যুদ্ধে হিন্দার পিতা ওকবাকে হত্যা করেছিলেন।

কিন্তু—তখনই ঘটে যুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট!

অন্ধকারের পর আলোর উদয় হয়। অনুরূপভাবে, এই রক্তক্ষয়ী বিশৃঙ্খলার মধ্যে তখনই ময়দানের মাঝে তরবারী হাতে এক দীপ্তিময় বীর উদিত হল।
এক সাহসী যুবকের নাম—রাসুলুল্লাহ ﷺ–এর চাচাতো ভাই ও জামাতা, যাকে রাসুল ﷺ ছোটকাল থেকে লালন পালন করে বড় করেছেন। রসুলের সেই সাহাবী—হযরত আলি ইবনে আবি তালিব (রাঃ)। আল্লাহর সিংহ।

শত্রু ঝাঁপিয়ে পড়ছে, আর আলি (রাঃ) এগিয়ে যাচ্ছেন।
প্রথম আঘাত—শত্রুর বুক ফেটে দু’টুকরো!
দ্বিতীয় আঘাত—আরেকজন ঘোড়সওয়ার মাটিতে লুটিয়ে পড়ল!
আলির চোখে আগুনের লেলিহান।

শত্রুরা থমকে যায়।
রাসুল ﷺ–এর চারপাশ রক্তে ভিজে গেছে, কিন্তু আলির তরবারি ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘুরছে।
একজন, দুজন, পাঁচজন… শত্রুরা একে একে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে।

আলি (রাঃ) রক্তে ভিজে যাচ্ছেন, কিন্তু থামছেন না।
প্রতিটি আঘাতে শত্রু দমে যাচ্ছে, প্রতিটি বজ্রধ্বনি মুসলমানদের বুক থেকে ভয়ের কুয়াশা সরিয়ে দিচ্ছে।
সীরাতগ্রন্থ ইবনে হিশাম (সীরাতুন্নবী, খণ্ড ৩) তে এসেছে—উহুদের সেই সংকটময় মুহূর্তে আলি (রাঃ) এতই প্রবলভাবে লড়লেন যে কুরাইশরা বারবার পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল।

ওই মুহুর্তে রাসুল ﷺ–কে ঘিরে যখন মুষ্টিমেয় সাহাবী প্রাণপণ লড়ছেন, তখন আলি (রাঃ) হয়ে উঠলেন যেন বজ্র।

এমন উত্তাল মুহূর্তে রাসুল ﷺ তাকিয়ে বললেন:

“আজ পুরো যুদ্ধক্ষেত্রের কেন্দ্র আমার আর আলির মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল।”
(মুসনাদ আহমদ, মাজমাউজ-জাওয়াইদ)

ইবনে আবি হাদিদ (শরহু নাহজুল বালাগাহ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩৮৪) বর্ণনা করেন:

"উহুদের দিনে আলি এমনভাবে রাসুল ﷺ–এর পাশে যুদ্ধ করেছেন যে, সাহাবীরা সাক্ষ্য দিয়েছেন—রাসুলের প্রাণ রক্ষার জন্য সর্বাধিক লড়েছেন আলিই।"

ইমাম তিরমিজি (সুনান তিরমিজি, হাদিস ৩৭৩৪) বলেছেন:

"আলিই আমার পরে সবচেয়ে সাহসী ব্যক্তি।"

হ্যাঁ!
উহুদের ময়দানে ইসলাম তখন নির্ভর করছিল দুইজনের উপর—রাসুল ﷺ আর আলি (রাঃ)।

যেখানে মুসলমানরা হারতে বসেছিল, আলির (রাঃ) বীরত্বে সেখানেই যুদ্ধক্ষেত্রের মোড় ঘুরে গেল। কাফেরদের নিশ্চিত জয় থেমে গেল, আর মুসলমানরা নতুন শক্তি ফিরে পেল।


👉 রেফারেন্স (আহলে সুন্নাতের কিতাব থেকে):

  1. সীরাত ইবনে হিশাম, খণ্ড ৩
  2. সুনান তিরমিজি, হাদিস ৩৭৩৪
  3. শরহু নাহজুল বালাগাহ – ইবনে আবি হাদিদ (আহলে সুন্নাত আলেম।)

Comments

Popular posts from this blog

১২ ইমাম নিয়ে শিয়া ও সুন্নীদের রায়।(১ম পর্ব)

আহলে বায়াতের মর্যাদা