ওমর (রা:) কে হত্যা
আজকের বিষয়:- ওমর (রা:) কে হত্যা এবং ওসমান (রা:) ইসলামের ৩য় খলিফা নির্বাচন।
হাদীসের সংকলনঃ-খেলাফতে রাশিদা পতনের পেছনের
কারণ(৩য় পর্ব)
লেখকঃ-শহীদুল ইসলাম সাজ্জাদ
১) ওমর রা: কে হত্যার কাহিনী এখানে বিস্তারিত বর্ণনা আছে।উনি আহত অবস্থায় ৬জনের কমিটি গঠন করেন।উনি বলে দেন তাদের মাঝেই সিদ্ধান্ত নিয়ে যেন খলিফা নির্বাচন হয়।কারণ ওনাদেরকে ওমর (রা:)খেলাফতের সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি মনে করতেন।এরপরে কিভাবে নির্বাচন হলো তা এই হাদীসে বিস্তারিত আলোচনা আছে।পরিশেষে হযরর ওসমান (রা:) নির্বাচিত হলেন।ওসমান রা: এর হাতে বায়াতের মাধ্যমে ইসলামের তৃতীয় খলিফা ওসমান (রা:) এর খেলাফত শুরু হয়।
২)এখানে দেখানো হয়েছে যে ওমর রা: এর মৃত্যুর পরে
আলী রা: তার খাটিয়া ধরে ওনার জন্য দোয়া করেছেন।কি দোয়া করেছেন পড়লেই বুঝতে পারবেন।
৩)আর আমি আরেকটি হাদিস দিয়েছি যেখান থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে ওমর রাঃ এর ইন্তেকালের পর থেকে উম্মতের মধ্যে ফাসাদ শুরু হবে।
তো হাদীস শুরু করা যাক----->>>>
১)আমর ইবনু মায়মূন (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ) -কে আহত হবার কিছুদিন পূর্বে মদীনায় দেখেছি যে তিনি হুযায়ফা ইবনু ইয়ামান (রাঃ) ও 'উসমান ইবনু হুনায়ফ (রহঃ) -এর নিকট দাঁড়িয়ে তাঁদেরকে লক্ষ্য করে বলছেন, তোমরা এটা কী করলে? তোমরা এটা কী করলে? তোমরা কি আশঙ্কা করছ যে, তোমরা ইরাক ভূমির উপর যে কর ধার্য করেছ তা বহনে ঐ ভূখণ্ড অক্ষম? তারা বললেন,
আমরা যে পরিমাণ কর ধার্য করেছি, ঐ ভূখন্ড তা বহনে সক্ষম। এতে বাড়তি কোন বোঝা চাপান হয়নি। তখন 'উমার (রাঃ) বললেন, তোমরা আবার চিন্তা করে দেখ যে, তোমারা এ ভূখণ্ডের উপর যে কর আরোপ করেছ তা বহন সক্ষম নয়? বর্ণনাকারী বলেন, তাঁরা বললেন, না। অতঃপর 'উমার (রাঃ) বললেন, আল্লাহ্ যদি আমাকে সুস্থ রাখেন তবে ইরাকের বিধবাগণকে এমন অবস্থায় রেখে যাব যে তারা আমার পরে কখনো অন্য কারো মুখাপেক্ষী না হয়। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর চতুর্থ দিন তিনি আহত হলেন। যেদিন ভোরে তিনি আহত হন, আমি তাঁর কাছে দাঁড়িয়েছিলাম এবং তাঁর ও আমার মাঝে আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) ছাড়া অন্য কেউ ছিল না। 'উমার (রাঃ) দু'কাতারের মধ্য দিয়ে চলার সময় বলতেন, কাতার সোজা করে নাও। যখন দেখতেন কাতারে কোন ত্রুটি নেই তখন তাকবীর বলতেন। তিনি অধিকাংশ সময় সূরা ইউসুফ, সূরা নাহল অথবা এ ধরণের সুরা প্রথম রাকআতে তিলাওয়াত করতেন, যেন অধিক পরিমাণ লোক প্রথম রাক'আতে শরীক হতে পারেন। তাকবীর বলার পরেই আমি তাঁকে বলতে শুনলাম, একটি কুকুর আমাকে আঘাত করেছে অথবা বলেন, আমাকে আক্রমণ করেছে। ঘাতক 'ইলজ' দ্রুত পলায়নের সময় দু'ধারী খঞ্জর দিয়ে ডানে বামে আঘাত করে চলছে। এভাবে তের জনকে আহত করল। এদের মধ্যে সাত জন শহীদ হলেন। এ অবস্থা দেখে এক মুসলিম তার লম্বা চাদরটি ঘাতকের উপর ফেলে দিলেন। ঘাতক যখন বুঝতে পারল সে ধরা পড়ে যাবে তখন সে আত্মহত্যা করল। উমার (রাঃ) আব্দুর রাহমান ইবনু আউফ (রাঃ) -এর হাত ধরে সামনে এগিয়ে দিলেন। 'উমার (রাঃ) -এর নিকটে যারা ছিল শুধুমাত্র তারাই ব্যাপারটি দেখতে পেল। আর মাসজিদের শেষে যারা ছিল তারা ব্যাপারটি এর অধিক বুঝতে পারল না যে, 'উমার (রাঃ)-এর কন্ঠস্বর শুনা যাচ্ছে না। তাই তারা “সুবহানাল্লাহ সুবহানাল্লাহ" বলতে লাগলেন। আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) তাঁদেরকে নিয়ে সংক্ষেপে সলাত আদায় করলেন। যখন মুসল্লীগণ চলে গেলেন, তখন উমার (রাঃ) বললেন, হে ইবনু আব্বাস (রাঃ) দেখ তো কে আমাকে আঘাত করল। তিনি কিছুক্ষণ অনুসন্ধান করে এসে বললেন, মুগীরাহ ইবনু শুবাহ (রাঃ) -এর গোলাম (আবূ লুলু)। 'উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, ঐ কারিগর গোলামটি? তিনি বললেন, হাঁ। 'উমার (রাঃ) বললেন, আল্লাহ্ তার সর্বনাশ করুন। আমি তার সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমার মৃত্যু ইসলামের দাবীদার কোন ব্যক্তির হাতে ঘটাননি। হে ইবনু 'আব্বাস (রাঃ) ভূমি এবং তোমার পিতা মদীনায় কাফির গোলামের সংখ্যা বৃদ্ধি পছন্দ করতেন। আব্বাস (রাঃ) -এর নিকট অনেক অমুসলিম গোলাম ছিল। ইবনু 'আব্বাস (রাঃ) বললেন, যদি আপনি চান তবে আমি কাজ করে ফেলি অর্থাৎ আমি তাদেরকে হত্যা করে ফেলি। উমার (রাঃ) বলেন, তুমি ভুল বলছ। কেননা তারা তোমাদের ভাষায় কথা বলে, তোমাদের কিবলামুখী হয়ে সলাত আদায় করে, তোমাদের মত হাজ্জ করে। অতঃপর তাঁকে তাঁর ঘরে নেওয়া হল। আমরা তাঁর সঙ্গে চললাম। মানুষের অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছিল, ইতোপূর্বে তাদের উপর এত বড় মুসীবত আর আসেনি। কেউ কেউ বলছিলেন, ভয়ের কিছু নেই। আবার কেউ বলছিলেন, আমি তাঁর সম্পর্কে আশংকাবোধ করছি। অতঃপর খেজুরের শরবত আনা হল, তিনি তা পান করলেন। কিন্তু তা তার পেট হতে বেরিয়ে পড়ল। অতঃপর দুধ আনা হল, তিনি তা পান করলেন। তাও তার পেট হতে বেরিয়ে পড়ল। তখন সকলেই বুঝতে পারলেন, মৃত্যু তাঁর অবশ্যম্ভাবী। আমরা তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। অন্যান্য লোকজনও আসতে শুরু করল। সকলেই তার প্রশংসা করতে লাগল। তখন যুবক বয়সী একটি লোক এসে বলল, হে
আমীরুল মু'মিনীন। আপনার জন্য আল্লাহ্র সু-সংবাদ রয়েছে; আপনি তা গ্রহণ করুন। আপনি নবী (সাল্লাল্লাহু *আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাহচর্য গ্রহণ করেছেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগেই আপনি তা গ্রহণ করেছেন, যে সম্পর্কে আপনি নিজেই অবগত আছেন অতঃপর আপনি খলীফা হয়ে ন্যায় বিচার করেছেন। অতঃপর আপনি শাহাদাত লাভ করেছেন। উমার (রাঃ) বললেন, আমি পছন্দ করি যে তা আমার জন্য ক্ষতিকর বা লাভজনক না হয়ে সমান সমান হয়ে থাকে। যখন যুবকটি চলে যেতে উদ্যত হল তখন তার লুঙ্গিটি মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছিল। "উমার (রাঃ) বললেন, যুবকটিকে আমার নিকট ডেকে আন। তিনি বললেন- হে ভাতিজা! তোমার কাপড়টি উঠিয়ে নাও। এটা তোমার কাপড়ের পরিচ্ছন্নতার জন্য এবং তোমার রবের নিকটও পছন্দনীয়। হে আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার, তুমি হিসাব করে দেখ আমার ঋণের পরিমাণ কত। তারা হিসাব করে দেখতে পেলেন ছিয়াশি হাজার (দিরহাম) বা এর কাছাকাছি। তিনি বললেন, যদি উমারের পরিবার পরিজনের মাল দ্বারা পরিশোধ হয়ে যায় তবে তা দিয়ে পরিশোধ করে দাও। অন্যথায় আদি ইবনু কা'ব এর বংশধরদের নিকট হতে সাহায্য গ্রহন কর। তাদের মাল দিয়েও যদি ঋণ পরিশোধ না হয় তবে কুরাইস করিলা হতে সাহায্য গ্রহণ করবে, এর বাহিরে কারো সাহায্য গ্রহণ করবে না। আমার পক্ষ হতে তাড়াতাড়ি ঋণ আদায় করে দাও। উম্মুল মু'মিনীন *আয়িশা (রাঃ) –এর খিদমতে এবং বল 'উমার আপনাকে সালাম পাঠিয়েছে। "আমীরুল মু'মিনীন' শব্দটি বলবে না। কেননা এখন আমি মু'মিনগণের আমীর নই। তাঁকে বল 'উমার ইবন খাত্তাব তাঁর সাথীদের পাশে দাফন হবার অনুমতি চাচ্ছেন। ইবন 'উমার (রাঃ) "আয়িশা (রাঃ) এর খিদমতে গিয়ে সালাম জানিয়ে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনি বললেন, প্রবেশ কর, তিনি দেখলেন, 'আয়িশা (রাঃ) বসে বসে কাঁদছেন। তিনি গিয়ে বললেন, "উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ) আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের পার্শ্বে দাফন হবার জন্য আপনার অনুমতি চেয়েছেন। "আয়িশা বললেন, আমার আকাঙ্খা ছিল। কিন্তু আজ আমি এ ব্যাপার আমার উপরে তাঁকে অগ্রগণ্য করছি। 'আবদুল্লাহ ইন্নু 'উমার (রাঃ) যখন ফিরে আসছেন তখন বলা হল- এই যে "আবদুল্লাহ ফিরে আসছে। তিনি বললেন, আমাকে উঠিয়ে বসাও। তখন এক ব্যক্তি তাকে ঠেস দিয়ে বসিয়ে ধরে রাখলেন। উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন কী সংবাদ? তিনি বললেন, আমীরুল মুমিনীন, আপনি যা কামনা করেছেন, তাই হয়েছে, তিনি অনুমতি দিয়েছেন। উমার (রাঃ) বললেন, আলহামদুলিল্লাহ। এর চেয়ে বড় কোন বিষয় আমার নিকট ছিল না। যখন আমার মৃত্যু হয়ে যাবে তখন আমাকে উঠিয়ে নিয়ে, তাঁকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, “উমার ই খাত্তাব (রাঃ) আপনার অনুমতি চাচ্ছেন। যদি তিনি অনুমতি দেন, তবে আমাকে প্রবেশ করাবে আর যদি অনুমতি না দেন তবে আমাকে সাধারণ মুসলিমদের গোরস্থানে নিয়ে যাবে। এ সময় উম্মুল মু'মিনীন হাফসা (রাঃ)-কে কতিপয় মহিলাসহ আসতে দেখে আমরা উঠে পড়লাম। হাফসা (রাঃ) তাঁর নিকট গিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদলেন। অতঃপর পুরুষরা প্রবেশের অনুমতি চাইলে, তিনি ঘরের ভিতর গেলে ঘরের ভেতর হতে হতেও আমরা তাঁর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। তাঁরা বললেন, হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনি ওয়াসিয়াত করুন এবং খলীফা মনোনীত করুন। উমার (রাঃ) বললেন, খিলাফতের জন্য এ কয়েকজন ছাড়া অন্য কাউকে আমি যোগ্যতম পাচ্ছি না, যাদের প্রতি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর ইন্তিকালের সময় রাখী ও খুশী ছিলেন। অতঃপর তিনি তাঁদের নাম বললেন, 'আলী, উসমান, যুবায়র, ত্বলহা, সাদ ও আবদুর রাহমান ই আউফ (রাঃ) এবং বললেন, আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার (রাঃ) তোমাদের সঙ্গে থাকবে। কিন্তু সে খিলাফত লাভ করতে পারবে না। তা ছিল শুধু সান্ত্বনা মাত্র। যদি খিলাফতের দায়িত্ব সা'দের (রাঃ) এর উপর ন্যস্ত করা হয় তবে তিনি এর জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি। আর যদি তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ খলীফা নির্বাচিত হন তবে তিনি যেন সর্ব বিষয়ে সা'দের সাহায্য ও পরামর্শ গ্রহণ করেন। আমি তাঁকে অযোগ্যতা বা খিয়ানতের কারণে অপসারণ করিনি। আমার পরের খলীফাকে আমি ওয়াসিয়াত করছি, তিনি যেন প্রথম যুগের মুহাজিরগণের হক সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাদের মান সম্মান রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন। এবং আমি তাঁকে আনসার সাহাবীগণের যাঁরা মহাজিরগণের আসার আগে এই নগরীতে
তোমাদের সঙ্গে থাকবে। কিন্তু সে খিলাফত লাভ করতে পারবে না। তা ছিল শুধু সান্ত্বনা মাত্র। যদি খিলাফতের দায়িত্ব সা'দের (রাঃ) এর উপর ন্যস্ত করা হয় তবে তিনি এর জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি। আর যদি তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ খলীফা নির্বাচিত হন তবে তিনি যেন সর্ব বিষয়ে সা'দের সাহায্য ও পরামর্শ গ্রহণ করেন। আমি তাঁকে অযোগ্যতা বা খিয়ানতের কারণে অপসারণ করিনি। আমার পরের খলীফাকে আমি ওয়াসিয়াত করছি, তিনি যেন প্রথম যুগের মুহাজিরগণের হক সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাদের মান সম্মান রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন। এবং আমি তাঁকে আনসার সাহাবীগণের যাঁরা মুহাজিরগণের আসার আগে এই নগরীতে (মদীনায়) বসবাস করে আসছিলেন এবং ঈমান এনেছেন, তাঁদের প্রতি সম্ভবহার করার ওয়াসিয়াত করছি যে তাঁদের মধ্যে নেককারগণের ওযর আপত্তি যেন গ্রহণ করা হয় এবং তাঁদের মধ্যে কারোর ভুলত্রুটি হলে তা যেন ক্ষমা করে দেয়া হয়। আমি তাঁকে এ ওয়াসিওয়াত ও করছি যে, তিনি যেন রাজ্যের বিভিন্ন শহরের আধিবাসীদের সদ্ব্যবহার করুন। কেননা তাঁরাও ইসলামের হিফাযতকারী। এবং তারাই ধনসম্পদের যোগানদাতা। তারাই শত্রুদের চোখের কাঁটা। তাদের হতে তাদের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে কেবলমাত্র তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ যেন যাকাত আদায় করা হয়। আমি তাঁকে পল্লীবাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করারও ওয়াসিয়াত করছি। কেননা তারাই আরবের ভিত্তি এবং ইসলামের মূল শক্তি। তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ এনে তাদের দরিদ্রদের মধ্যে যেন বিলিয়ে দেয়া হয়। আমি তাঁকে আল্লাহ ও তাঁর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর জিম্মীদের (অর্থাৎ সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়) বিষয়ে ওয়াসিয়াত করছি যে, তাদের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার যেন পুরা করা হয়। তাদের পক্ষাবলম্বনে যেন যুদ্ধ করা হয়, তাদের শক্তি সামর্থ্যের অধিক জিযিয়া যেন চাপানো না হয়। 'উমার (রাঃ) এর ইন্তিকাল হয়ে গেলে আমরা তাঁর লাশ নিয়ে পায়ে হেঁটে চললাম। 'আবদুল্লাহ্ ইবনু 'উমার (রাঃ) 'আয়িশা (রাঃ) কে সালাম করলেন এবং বললেন, 'উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ) অনুমতি চাচ্ছেন। 'আয়িশা (রাঃ) বললেন, তাকে প্রবেশ করাও। অতঃপর তাঁকে প্রবেশ করান হল এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের পার্শ্বে দাফন করা হল। যখন তাঁর দাফনকাজ শেষ হল, তখন ঐ ব্যক্তিবর্গ একত্রিত হলেন। তখন 'আবদুর রাহমান (রাঃ) বললেন, তোমারা তোমাদের বিষয়টি তোমাদের মধ্য হতে তিনজনের উপর ছেড়ে দাও। তখন যুবায়র (রাঃ) বললেন, আমি আমার বিষয়টি 'আলী (রাঃ) –এর উপর অর্পণ করলাম। ত্বলহা (রাঃ) বললেন, আমার বিষয়টি উসমান (রাঃ) -এর উপর ন্যস্ত করলাম। সা'দ (রাঃ) বললেন, আমার বিষয়টি "আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) উপর ন্যস্ত করলাম। অতঃপর 'আবদুর রহমান (রাঃ) উসমান ও 'আলী (রাঃ)-কে বললেন, আপনাদের দু'জনের মধ্য হতে কে এই দায়িত্ব হতে অব্যাহতি পেতে ইচ্ছা করেন? এ দায়িত্ব অপর জনের উপর অর্পন করব। আল্লাহ্ ও ইসলামের হক আদায় করা তাঁর অন্যতম দায়িত্ব হবে। কে অধিকতর যোগ্য সে সম্পর্কে দুজনেরই চিন্তা করা উচিত। ব্যক্তিদ্বয় চুপ থাকলেন। তখন 'আবদুর রাহমান (রাঃ) নিজেই বললেন আপনারা এ দায়িত্ব আমার উপর ন্যস্ত করতে পারেন কি? আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আপনাদের মধ্যকার যোগ্যতম ব্যক্তিকে নির্বাচিত করতে একটুও ত্রুটি করব না। তাঁরা উভয়ে বললেন, হাঁ তাদের একজনের হাত ধরে বললেন, রসূল (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর সঙ্গে আপনার যে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা এবং ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামিতা আছে তা আপনিও ভালভাবে জানেন। আল্লাহর ওয়াস্তে এটা আপনার জন্য জরুরী হবে যে, যদি আপনাকে খলীফা মনোনীত করি তাহলে আপনি ইন্সাফ প্রতিষ্ঠা করবেন।
আর যদি উসমান (রাঃ) কে মনোনীত করি তবে আপনি তাঁর কথা শুনবেন এবং তাঁর প্রতি অনুগত থাকবেন। অতঃপর তিনি অপর জনের সঙ্গে একান্তে অনুরূপ কথা বললেন। এভাবে অঙ্গীকার গ্রহণ করে তিনি বললেন, হে "উসমান (রাঃ) আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। তিনি [আবদুর রাহমান (রাঃ)], তাঁর হাতে বায়'আত করলেন। অতঃপর 'আলী (রাঃ) তাঁর 'উসমান (রাঃ)-এর বায়'আত করলেন। অতঃপর মদীনাবাসীগণ এগিয়ে এস সকলেই বায়আত করলেন। অপর বর্ণনায়ঃ মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন,
উমর (রাঃ) যে দলটিকে খলীফা নির্বাচনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তাঁরা সমবেত হয়ে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করলেন। 'আবদুর রহমান (রাঃ) তাঁদেরকে বললেন, আমি তো এমন লোক নই যে এ ব্যাপারে (নির্বাচিত হওয়ার) আশা করব। কিন্তু আপনারা যদি ইচ্ছে করেন তবে আপনাদের থেকে একজনকে আমি নির্বাচিত করে দিতে পারি। তাঁরা একমত হয়ে "আবদুর রহমানের উপর দায়িত্ব দিলেন। যখন তাঁরা 'আবদুর রহমানের উপর দায়িত্ব দিলেন, তখন সকল লোক আবদুর রহমানের প্রতি ঝুঁকে পড়ল। এমনকি আমি একজনকেও সেই দলের অনুসরণ করতে কিংবা তাঁদের পিছনে যেতে দেখলাম না। লোকেরা আবদুর রহমানের প্রতিই ঝুঁকে পড়ল এবং কয়েক রাত তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করতে থাকল। শেষে সেই রাত এল, যে রাতের শেষে আমরা উসমান (রাঃ)-এর হাতে বায়আত করলাম। মিসওয়ার (রাঃ) বলেন, রাতের একাংশ অতিবাহিত হবার পর "আরদুর রহমান (রাঃ) আমার কাছে আসলেন এবং দরজায় খটখট করলেন। ফলে আমি জেগে গেলাম। তিনি বললেন, তোমাকে ঘুমন্ত দেখছি। আল্লাহর কসম! আমি এ তিন রাতের মাঝে বেশি ঘুমাতে পারিনি। যাও, যুবায়র ও সাদকে ডেকে আন। আমি তাঁদেরকে তার কাছে ডেকে আনলাম। তিনি তাদের দু'জনের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। তারপর আমাকে আবার ডেকে বললেন, 'আলীকে আমার কাছে ডেকে আন। আমি তাঁকে ডেকে আনলাম। তিনি তাঁর সঙ্গে অর্ধরাত্রি পর্যন্ত গোপন পরামর্শ করলেন। তারপর 'আলী (রাঃ) তাঁর নিকট হতে উঠে গেলেন। তবে তিনি আশায় ছিলেন। আর 'আবদুর রহমান (রাঃ) "আলী (রাঃ) থেকে কিছু (বিরোধিতার আশঙ্কা করছিলেন। তারপর তিনি বললেন, 'উসমানকে আমার কাছে ডেকে আন। তিনি তাঁর সঙ্গে গোপনে পরামর্শ করলেন। ফজরের সময় মুআযযিন (এর আযান) তাদের দু'জনকে পৃথক করল। লোকেরা যখন ফজরের সালাত পড়ল এবং সেই দলটি মিম্বরের নিকট জমায়েত হলো তখন তিনি মুহাজির ও আনসারদের যারা হাজির ছিলেন তাঁদেরকে ডেকে আনতে পাঠালেন এবং সেনা প্রধানদেরকেও ডেকে আনতে পাঠালেন এবং এরা সবাই উমরের সঙ্গে গত হাচ্ছে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যখন সকলে এসে জমায়েত হন, তখন 'আবদুর রহমান (রাঃ) ভাষণ আরম্ভ করলেন। তারপর বলেন, হে আলী! আমি জনমত যাচাই করেছি, তারা উসমানের সমকক্ষ কাউকে মনে করে না। কাজেই তুমি অবশ্যই অন্য পথ ধরো না। তখন তিনি ['উসমান (রাঃ) -কে সম্বোধন করে] বললেন, আমি আল্লাহর, তাঁর রসুলের ও তাঁর পরবর্তী উভয় খালীফার আদেশ অনুযায়ী আপনার নিকট বায়আত করছি। অতঃপর 'আবদুর রহমান (রাঃ) তাঁর কাছে বায় আত করলেন। অতঃপর মুহাজির, আনসার, সেনাপ্রধান এবং সাধারণ মুসলিম তাঁর কাছে বায়আত করলেন।[সহিহ বুখারী: ৩৭০০ ও ৭২০৭)
২)ইবনু 'আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমিও ঐ দলের সঙ্গে দু'আয় রত ছিলাম, যারা 'উমার ইবনু খাত্তাবের জন্য দু'আ করেছিল। তখন তাঁর লাশটি খাটের উপর রাখা ছিল। এমন সময় এক লোক হঠাৎ আমার পিছন দিক হতে তার কনুই আমার কাঁধের উপর রেখে উমার (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলল, আল্লাহ্ আপনার প্রতি রহম করুন। আমি অবশ্য এ আশা পোষণ করি যে, আল্লাহ্ আপনাকে আপনার উভয় সঙ্গীর সঙ্গেই রাখবেন। কেননা, আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, আমি, আবূ বার ও উমার এক সঙ্গে ছিলাম, আমি, আবূ বকর ও উমার এ কাজ করেছি। আমি, আবু বকর ও 'উমার চলেছি। আমি এ আশাই পোষণ করি যে, আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে তাদের দু'জনের সাথেই রাখবেন। আমি পেছনে চেয়ে দেখলাম, তিনি 'আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ)। [সহিহ বুখারী: ৩৬৭৭, সহীহ মুসলিম ৬১৮৭]
৩)ওমর রাঃ এর পর থেকে উম্মতের মধ্যে ফাসাদ শুরু হবেঃ-
হুযাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একবার আমরা উমার (রাঃ)-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। হঠাৎ তিনি বললেন, ফিতনা সম্পর্কে নবী (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বক্তব্য তোমাদের মধ্যে কে স্মরণ রেখেছে? হুযাইফাহ (রাঃ) বললেন, (নবী (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন) মানুষ নিজের পরিবার, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও প্রতিবেশীর ব্যাপারে ফিতনায় পতিত হয়, সালাত, সদাকাহ, সৎকাজের আদেশ, অসৎ কাজের নিষেধ তার সে পাপকে মুছে ফেলে। তিনি বলেন, আমি তোমাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করিনি, এবং সে ফিনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছি যা সাগর লহরীর মত ঢেউ খেলবে। হুযাইফাহ (রাঃ) বললেন, হে আমীরুল মু'মিনীন! সে ফিনায় আপনার কোন অসুবিধা হবে না। কেননা সে ফিতনা ও আপনার মাঝে একটি বন্ধ দরজা আছে। উমার (রাঃ) বললেন, দরজাটি কি ভেঙ্গে ফেলা হবে, না খুলে দেওয়া হবে? তিনি বললেন, না বরং ভেঙ্গে ফেলা হবে। উমার (রাঃ) বললেন, তা হলে তো সেটা আর কখনো বন্ধ করা যাবে না। (হুযাইফাহ বলেন) আমি বললাম হ্যাঁ। (শাকীক বলেন) আমরা হুযাইফাহ (রাঃ) কে জিজ্ঞেস - করলাম, উমার (রাঃ) কি দরজাটি সম্পর্কে জানতেন? উত্তরে তিনি বললেন, হ্যাঁ। যেমন আমি সুনিশ্চিতভাবে জানি যে আগামী দিনের পর রাত আসবে। কেননা আমি তাকে এমন হাদীস বর্ণনা করেছিলাম যা ত্রুটিমুক্ত। (শাকীক বলেন) দরজাটি কে সম্পর্কে আমরা হুযাইফাহ (রাঃ) কে জিজ্ঞেস করতে আমরা ভয় পাচ্ছিলাম, তাই আমরা মাসরুককে জিজ্ঞেস করতে বললাম। তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, দরজাটি কে? উত্তরে তিনি বললেন, 'উমার (রাঃ) (নিজেই)। [সহিহ বুখারী: ৭০৯৬, সহিহ মুসলিম: ৭২৬৮]

Comments
Post a Comment