আবু বকর রা: কে ইসলামের ১ম খলিফা নির্বাচন
আজকের বিষয়:-আবু বকর রা: কে ইসলামের ১ম খলিফা নির্বাচন এবং শিয়া সুন্নী দ্বন্দের প্রারম্ভ।
হাদীসের সংকলনঃ-খেলাফতে রাশিদা পতনের পেছনের
কারণ(২য় পর্ব)
লেখকঃ-শহীদুল ইসলাম সাজ্জাদ
আজকের এই পর্ব আমি নিজে থেকে কোন কিছুই বর্ননা করব না।হাদীসগুলো অনেক লম্বা।তাই আমি শুধু ইমাম বুখারী হাদীসে যা বর্ননা করেছেন তার ই খন্ড খন্ড করে শুধু হাদিসটির ব্যাপারে আলোচনা করব।আলোচনার পরে পুরো হাদীসটি দিয়ে দিব।কারণ আজকে পর্ব খুব সেনসিটিভ।তাই আমি কারোও পক্ষে বা বিপক্ষে বর্ননা করি নি।হাদীসে যা আছে তাই শুধু নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করেছি।
রাসুল(সা:) এর ইন্তেকালের পর কে খেলাফত এর পদে কে অধিষ্ঠিত হবে সেটা নিয়ে বানু সাঈদা নামক যায়গায় আলোচনা শুরু হয়।আলী(রা:)নবিজীর দাফন কাফন এসবে ব্যস্ত ছিলেন।তাই ওনার(হযরত আলী) অনুপস্থিতিতেই কে খলিফা হবে সাহাবীরা নির্বাচন এর জন্য সাঈদা নামক যায়গায় গিয়ে আলোচনা করতে থাকেন।
আসলে সেই যায়গায় অনেক বড় একটা ঝামেলা শুরু হয়।মানুষ মিলে সাদ ইবনু 'উবাদাহ (রাঃ) কে খলিফা বানাতে চাইছিল।এগুলো নিয়ে একটা দ্বন্দ শুরু হয়।
কেও বলেন যে যে যার বংশ হতে খলিফা নির্বাচিত হোক।কিন্তু আবু বকর রা: বলেন যে নবিজী বলেছিলেন যে খলিফা যেন কুরাইশ থেকে নির্বাচিত হয়।
এইসব দ্বন্দের মধ্যে হযরত ওমর (রাঃ) একটি ভাষণ দেন এবং উনি হযরত আবু বকর (রাঃ) এর হাতে হাত বাড়িয়ে দেন।এর দেখাদেখি সবাই হযরত আবু বকর (রা:) এর বায়াত নেন। আমি বুখারী থেকে এই বর্ণনা নিয়েছি। কি কারনে উনি আবু বকর রাঃ এর হাতে বায়াত নেয়া কে সঠিক মনে করেন তা নিয়ে ওমর রা: অনেক দীর্ঘ আলোচনা করেন।পুরো আলোচনা আমি দিয়েছি।হাদীসটি থেকে পরিষ্কার যে হযরত আবু বকর (রা:) খলিফা নির্বাচিত হন বানু সাঈদায় হঠাৎ করে।সহিহ বুখারীতে বর্ননা আছে এভাবে:-
"উমার (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা সে সময়ের জরুরী বিষয়ের মধ্যে আবূ বকরের বায়আতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন কিছুকে মনে করিনি। আমাদের ভয় ছিলে যে, যদি বায়আতের কাজ অসম্পন্ন থাকে, আর এ জাতি থেকে আলাদা হয়ে যাই তাহলে তারা আমাদের পরে তাদের কারো হাতে বায়আত করে নিতে পারে। তারপর হয়ত আমাদেরকে নিজ ইচ্ছার তখন আনসারদের এক ব্যাক্ত বলে ওঠল, আমি এ জাতের আভজ্ঞ ও বংশগত সম্ভ্রান্ত। হে কুরায়েশ গণ! আমাদের হতে হবে এক আমীর আর তোমাদের হতে হবে এক আমীর। এ সময় অনেক কথা ও হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল।
আমি এ মতবিরোধের দরুন শংকিত হয়ে পড়লাম। তাই আমি বললাম, হে আবূ বকর! আপনি হাত বাড়ান। তিনি হাত বাড়ালেন। আমি তাঁর হাতে বায়আত করলাম। মুহাজিরগণও তাঁর হাতে বায় আত করলেন। অতঃপর আনসারগণও তাঁর হাতে বায়আত করলেন। আর আমরা সা'দ ইবনু 'উবাদাহ (রাঃ) এর দিকে এগোলাম। তখন তাদের এক লোক বলে উঠল, তোমরা সা'দ ইবনু উবাদাকে জানে মেরে ফেলেছ। তখন আমি বললাম, আল্লাহ্ সা'দ ইবনু ওবাদাকে হত্যা করেছেন। 'উমার (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা সে সময়ের জরুরী বিষয়ের মধ্যে আবু বকরের (রা:) এর বায়আতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন কিছুকে মনে করিনি। আমাদের ভয় ছিল যে, যদি বায়আতের কাজ অসম্পন্ন থাকে, আর এ জাতি থেকে আলাদা হয়ে যাই তাহলে
তারা আমাদের পরে তাদের কারো হাতে বায়আত করে নিতে পারে। তারপর হয়ত আমাদেরকে নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের অনুসরণ করতে হত, না হয় তাদের বিরোধিতা করতে হত, ফলে তা মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াত। অতএব যে ব্যক্তি মুসলিমদের পরামর্শ ছাড়া কোন ব্যক্তির হাতে বায়আত করবে তার অনুসরণ করা যাবে না। আর ঐ লোকেরও না, যে তার অনুসরণ করবে। কেননা উভয়েরই নিহত হওয়ার আশংকা আছে। [সহিহ বুখারী: ৪৩৫৯ ও ৬৮৩০]
কিন্তু শিয়ারা ওমর রা: এর এই মত এর সাথে দ্বিমত পোশন করেন ।শিয়াদের দাবী,গাদিরে খুমে সোয়া লাখ সাহাবীর মাঝে নবিজী সা: আলী রা: কে মাওলা(অভিভাবক) বানিয়েছেন।রাসুলুলুল্লাহ( সা: ) বিদায় হজ্বের সময় গদিরে খুম নামক স্থানে অসংখ্য সাহাবীকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
" আমি তোমাদের নিকট বেশীদিন আর থাকবো না।আমি দুটি ভারী বস্তু তোমদের নিকট রেখে দিয়ে যাচ্ছি।এক হলো কোরআন।যাকে আকড়ে ধরলে তোমরা কোনদিন গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট হবে না।অপরটি হলো আমার আহলে বায়াত(নবি পরিবার)।আহলে বায়াত এর কথা তোমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।"
এভাবে নবী কয়েকবার বললেন।এরপরে নবি(সা:)
আলি রা: এর হাতে হাত রেখে উচু করে তুলে ধরে বললেন, ''আমি(রাসূল) যার মাওলা(অভিভাবক) আলীও তার মাওলা। (সহিহ মুসলিম:৬২২৫-৬২২৯, তিরমিযী:৩৭১৩)
[হাদীসটি শুধু সহীহ ই না এমনকি মুতাওয়াতির।]
এইভাবে রাসুল(সা:) সবার সামনে হযরত আলি রা: কে মাওলা ঘোষণা দেন।তাই শিয়ারা মনে করেন,এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে রাসুলুল্লাহ সা: এর পর রেখে যাওয়া প্রতিনিধি(খলিফা) হলেন আলী রা:।অথচ আবু বকর ও ওমর রা: বানু সাকীফায় গিয়ে খলিফা নির্বাচিত করে ফেলেন।যা ওনারা ভুল করেছেন।
শিয়ারা এখানে যা মন চায় তাই মনে করুক।মূল কথা হলো এই ব্যাপারে আলী(রা:) এর মতামত কি?এই ব্যাপার নিয়ে আলি(রা:) এর প্রায় ৬মাস পর্যন্ত এখতেলাফ ছিল।উনি এই সময় আবু বকর(রা:) কে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেন নি।
ইমাম বুখারী বর্ননা করেন, ফাতিমা(রা:) এর ইন্তেকালের পরে আলী(রা:) হযরত আবু বকর কে ডাকালেন।ডেকে বললেন,
"আমরা আপনার শ্রেষ্ঠত্ব এবং আল্লাহ আপনাকে যা দিয়েছেন তা ভাল করেই জানি, এবং আমরা হিংসা করি না। আল্লাহ আপনাকে যা দান করেছেন তার মধ্যে, কিন্তু আপনি শাসনের প্রশ্নে আমাদের সাথে পরামর্শ করেননি এবং আমরা ভেবেছিলাম যে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে আমাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে আমরা এতে অধিকার পেয়েছি।"(সহিহ বুখারি:৪২৪০-৪২৪১,সহিহ মুসলিম:৪৫৮০)
এরপরে হযরত আবু বকর(রা:) এর চোখে অশ্রু পতিত হয়।উনি চোখে অশ্রু নিয়ে বলেন,
"তখন আবু বকরের চোখ বেয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয়। আর আবু বকর যখন কথা বললেন, তখন তিনি বললেন, “যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা আমার কাছে আমার নিকট আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সুসম্পর্ক রাখার চেয়ে প্রিয়। তার সম্পত্তি নিয়ে আমার ও তোমাদের মধ্যে যে বিরোধ দেখা দিয়েছে, আমি তা ভালোমতো ব্যয় করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব এবং আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে যে বিধি-বিধান অনুসরণ করতে দেখেছি, তার নিষ্পত্তি করতে আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। "(সহিহ বুখারি:৪২৪০-৪২৪১, সহিহ মুসলিম:৪৫৮০)
এটি শোনার পরে আলী(রা:) বলেন যে ওনাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে দিবেন।ইমাম বুখারী বর্ননা করেন আলী(রা:)সবার সামনে ৬ মাস পরে আবু বকর(রা:) কে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে দেন এই বলে,
"তিনি যা করেছিলেন তা তিনি আবু বকরের প্রতি ঈর্ষার কারণে করেননি বা তার প্রতিবাদ হিসেবে করেননি। যে আল্লাহ তাকে অনুগ্রহ করেছেন। 'আলী যোগ করেছেন, "কিন্তু আমরা মনে করতাম যে আমাদেরও এই বিষয়ে (শাসনের) কিছু অধিকার আছে এবং তিনি (অর্থাৎ আবু বকর) এই বিষয়ে আমাদের সাথে পরামর্শ করেননি, এবং তাই আমাদের দুঃখিত করেছেন।" এতে সকল মুসলমান খুশি হয়ে বললেন, আপনি ঠিকই করেছেন। মুসলমানরা তখন আলীর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ তিনি লোকেদের যা করেছিলেন (অর্থাৎ আবু বকরের আনুগত্যের শপথ করা) সেদিকে ফিরে আসেন।"(সহিহ বুখারি:৪২৪০-৪২৪১, সহিহ মুসলিম:৪৫৮০)
নবিজী (সা:) এই ব্যাপারে ভবিষ্যতবানী করেছিলেন।উনি বলেন নবুওতের ভিত্তিতে ইসলামী খেলাফত ৩০ বছর থাকবে।এরপরে ইসলামী খেলাফত ধ্বংস হবে এবং রাজতন্ত্র শুরু হবে।নবি(সা:) এর ভবিষ্যতবানী বাস্তবায়িত হয়।আর আমরা বাস্তবেই দেখতে পাই যে বানু উমাইয়ারা হযরত আলী(রা:) কে খলিফা ই মানতো না।
সাফীনাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ "আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ নবুওয়্যাতের ভিত্তিতে পরিচালিত খিলাফত ত্রিশ বছর অব্যাহত থাকবে। অতঃপর আল্লাহর যাকে ইচ্ছা রাজত্ব বা তাঁর রাজত্ব দান করবেন। সাঈদ (রহঃ) বলেন, আমাকে সাকীনাহ (রাঃ) বলেছেন, হিসেব করো, আবূ বকর (রাঃ) দুই বছর, "উমার (রাঃ) দশ বছর, উসমান (রাঃ) বারো বছর ও আলী (রাঃ) এতো বছর খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেছেন। সাঈদ (রহঃ) বলেন, আমি সাফীনাহ (রাঃ) - কে বললাম, এরা ধারণা করে যে, 'আলী (রাঃ) খলীফাহ ছিলেন না। তিনি বলেন, বর্নী যারকা অর্থাৎ মাওয়ানের বংশধরগণ মিথ্যা বলেছে। [আবু দাউদ: ৪৬৪৬, জামে আত-তিরমিজি, মুসনাদে আহমাদ ১৮৪৩০ (৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা ২৭৩): ২২২৬, মিশকাতুল মাসাবিহ ৫৩৭৮, শায়খ যুবাইর আলি যাই এবং শায়খ শুআইব আরনাউৎ বলেন: এর সনদ সহীহ]
-------------------
রাসুলুল্লাহ সা: এর ইন্তেকালের পরে আবু বকর রা: এর কাছে বায়াত।এই হাদীস--->>
১)জারীর (রা.) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি ইয়ামানে ছিলাম। এ সময়ে একদা যুকালা ও যু'আমর নামে ইয়ামানের দু'ব্যক্তির সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হল। আমি তাদেরকে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর হাদীস শোনাতে লাগলাম। (বর্ণনাকারী বলেন) এমন সময়ে 'আমর জারীর (রাঃ)- কে বললেন, তুমি যা বর্ণনা করছ তা যদি তোমার সাথীরই [নবী (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর কথা হয়ে থাকে তা হলে জেনে নাও যে, তিনদিন আগে তিনি ইন্তিকাল করে গেছেন। (জারীর বলেন, এ কথা শুনে আমি মদীনার দিকে ছুটলাম) তারা দু'জনেও আমার সঙ্গে সম্মুখের দিকে চললেন। অতঃপর আমরা একটি রাস্তার ধারে পৌঁছলে মদীনার দিক থেকে আসা একদল সওয়ারীর সাক্ষাৎ পেলাম। আমরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর ওফাত হয়ে গেছে। মুসলিমদের পরামর্শক্রমে আবূ বকর (রাঃ) খলীফা নির্বাচিত হয়েছেন। তারপর তারা দু'জন (আমাকে) বলল, (মদিনায়) তোমার সাথী [আবূ বকর (রাঃ)]- কে বলবে যে, আমরা কিছুদূর পর্যন্ত এসেছিলাম। সম্ভবত আবার আসব ইনশাআল্লাহ, এ কথা বলে তারা দু'জনে ইয়ামানের দিকে ফিরে গেল। এরপর আমি আবূ বকর (রাঃ)- কে তাদের কথা জানালাম।
তিনি বললেন, তাদেরকে তুমি নিয়ে আসলে না কেন? পরে আরেক সময় 'আমর আমাকে বললেন, হে জারীরা তুমি আমার চেয়ে অধিক সম্মানী। তবুও আমি তোমাকে একটা কথা জানিয়ে দিচ্ছি যে, তোমরা আরব জাতি ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণের মধ্যে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা একজন আমীর মারা গেলে। অপরজনকে (পরামর্শের ভিত্তিতে) আমির বানিয়ে নেবে। আর তা যদি তরবারির জোরে ফায়সালা হয় তা হলে তোমাদের আমীরগণ রাজা বাদশাহর মতোই হয়ে যাবে। তারা রাজাদের রাগ করার মতই রাগ করবে। রাজাদের খুশি হওয়ার মতই খুশি হবে। অপর বর্ণনায়ঃ ই 'আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমি মুহাজিরদের কতক লোককে পড়াতাম। তাঁদের মধ্যে আবদুর রহমান ইবনু আওফ (রাঃ) অন্যতম ছিলেন। একবার আমি তাঁর মিনার বাড়িতে ছিলাম। তখন তিনি 'উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ) এর সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ হাচ্ছে রয়েছেন। এমন সময় আবদুর রহমান (রাঃ) আমার কাছে ফিরে এসে বললেন, যদি আপনি ঐ লোকটিকে দেখতেন, যে লোকটি আজ আমীরুল মু'মিনীন-এর কাছে এসেছিল এবং বলেছিল, হে আমীরুল মু'মিনীন! অমুক ব্যক্তির ব্যাপারে আপনার কিছু করার আছে কি যে লোকটি বলে থাকে যে, যদি "উমার মারা যান তাহলে অবশ্যই অমুকের হাতে বায়আত করব। আল্লাহর কসম! আবূ বকরের বায়আত আকস্মিক ব্যাপার-ই ছিল। ফলে তা হয়ে যায়। এ কথা শুনে তিনি ভীষণভাবে রাগান্বিত হলেন। তারপর বললেন, ইনশা আল্লাহ্ সন্ধ্যায় আমি অবশ্যই লোকদের মধ্যে দাঁড়াব আর তাদেরকে ঐসব লোক থোকে সতর্ক করে দিব, যারা তাদের বিষয়াদি আত্মসাৎ করতে চায়। "আবদুর রহমান (রাঃ) বলেন, তখন আমি বললাম, হে আমিরুল মু'মিনীন! আপনি এমনটা করবেন না। কারণ, হাজ্জের মওসুম নিম্নস্তরের ও নির্বোধ লোকদেরকে একত্রিত করে। আর এরাই আপনার নৈকট্যের সুযোগে প্রাধান্য বিস্তার করে ফেলবে, যখন আপনি লোকদের মধ্যে দাঁড়াবেন। আমার ভয় হচ্ছে, আপনি যখন দাঁড়িয়ে কোন কথা বলবেন তখন তা সব জায়গায় তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়বে। আর তারা তা ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারবে না। আর সঠিক রাখতেও পারবে না। সুতরাং মদীনা পৌঁছা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। আর তা হল হিজরাত ও সুন্নাতের কেন্দ্রস্থল। ফলে সেখানে জ্ঞানী ও সুধীবর্গের সঙ্গে মিলিত হবেন। আর যা বলার তা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারবেন। জ্ঞানী ব্যক্তিরা আপনার কথাকে সঠিকভাবে বুঝতে পারবে ও সঠিক ব্যবহার করবে।তখন উমার (রাঃ) বললেন, জেনে রেখো! আল্লাহর কসম! ইনশাআল্লাহ্ আমি মাদীনাহ্ পৌঁছার পর সর্বপ্রথম এ কাজটি নিয়ে ভাষণের জন্য দাঁড়াব। ইবনু "আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমরা যিলহাজ্জ মাসের শেষ দিকে মদিনায় ফিরলাম। যখন জুমুআহর দিন এল সূর্য অস্ত যাওয়ার উপক্রমের সঙ্গে সঙ্গে আমি মসজিদে গেলাম। পৌঁছে দেখি, সাঈদ ইবনু যায়দ ইবনু 'আমর ইবনু নুফাইল (রাঃ) মিম্বরের গোড়ায় বসে আছেন, আমিও তার পাশে এমনভাবে বসলাম যেন আমার হাঁটু তার হাঁটু স্পর্শ করছে। অল্পক্ষণের মধ্যে উমার ইবন খাত্তাব (রাঃ) বেরিয়ে আসলেন। আমি যখন তাঁকে সামনের দিকে আসতে দেখলাম তখন সা'ঈদ ইবনু যায়দ ইবনু 'আমর ইবনু নুফায়লকে বললাম, আজ সন্ধ্যায় অবশ্যই তিনি এমন কিছু কথা বলবেন যা তিনি খলীফা হওয়া থেকে আজ পর্যন্ত বলেননি। কিন্তু তিনি আমার কথাটি উড়িয়ে দিলেন এবং বললেন, আমার মনে হয় না যে, তিনি এমন কোন কথা বলবেন, যা এর আগে বলেননি। এরপর উমর (রাঃ) মিম্বরের উপরে বসলেন।। যখন মুয়ানগণ আযান থেকে ফারিগ হয়ে গেলেন তখন তিনি
দাঁড়ালেন। আর আল্লাহ যথোপযুক্ত প্রশংসা করলেন। তারপর বললেন,
''আজ আমি তোমাদেরকে
এমন কথা বলতে চাই, যা আমারই বলা কর্তব্য। হয়তবা কথাটি আমার মৃত্যুর সন্নিকট সময়ে হচ্ছে। তাই যে ব্যক্তি কথাগুলো ঠিকভাবে বুঝে সংরক্ষণ করবে সে যেন কথাগুলো ঐসব স্থানে পৌঁছে দেয় যেখানে তার সওয়ারী পৌঁছবে। আর যে ব্যক্তি কথাগুলো ঠিকভাবে বুঝতে আশংকাবোধ করছে আমি তার জন্য আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করা ঠিক মনে করছি না। নিশ্চয় আল্লাহ্ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - কে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন। আর তাঁর উপর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। এবং আল্লাহর অবতীর্ণ বিষয়াদির একটি ছিল রজমের আয়াত। আমরা সে আয়াত পড়েছি, বুঝেছি, আয়ত্ত করেছি। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পাথর মেরে হত্যা করেছেন। আমরাও তাঁর পরে পাথর মেরে হত্যা করেছি। আমি আশংকা করছি যে, দীর্ঘকাল অতিবাহিত হবার পর কোন লোক এ কথা বলে ফেলতে পারে যে, আল্লাহর কসম! আমরা আল্লাহর কিতাবে পাথর মেরে হত্যার আয়াত পাচ্ছি না। ফলে তারা এমন একটি ফরয ত্যাগের কারণে পথভ্রষ্ট হবে, যা আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ঐ ব্যক্তির উপর পাথর মেরে হত্যা অবধারিত, যে বিবাহিত হবার পর যিনা করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী। যখন সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবে অথবা গর্ভ বা স্বীকারোক্তি পাওয়া যাবে। তেমনি আমরা আল্লাহর কিতাবে এও পড়তাম যে, তোমরা তোমাদের বাপ-দাদা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না। এটি তোমাদের জন্য কুফরী যে, তোমরা স্বীয় বাপ-দাদা থেকে বিমুখ হবে। অথবা বলেছেন, এটি তোমাদের জন্য কুফরী যে, স্বীয় বাবা-দাদা থেকে বিমুখ হবে। জেনে রেখো! রসুলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা সীমা ছাড়িয়ে আমার প্রশংসা করো না, যেভাবে ঈসা ইবনু মরিয়ামের সীমা ছাড়িয়ে প্রশংসা করা হয়েছে। তোমরা বল, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল। এরপর আমার কাছে এ কথা পৌঁছেছে যে, তোমাদের কেউ এ কথা বলছে যে, আল্লাহর কসম! যদি 'উমার মারা যায় তাহলে আমি অমুকের হাতে বাইআত করব। কেউ যেন এ কথা বলে ধোঁকায় না পড়ে যে আবৃ বকর এর বায়াত ছিল আকস্মিক ঘটনা। ফলে তা সংঘটিত হয়ে যায়। জেনে রেখো! তা অবশ্যই এমন ছিল। তবে আল্লাহ আকস্মিক বায়আতের ক্ষতি প্রতিহত করেছেন। সফর করে সওয়ারীগুলোর ঘাড় ভেঙ্গে যায় - এমন স্থান পর্যন্ত মানুষের মাঝে আবূ বাকরের মত কে আছে? যে কেউ মুসলিমদের পরামর্শ ছাড়া কোন লোকের হাতে বায়'আত করবে, তার অনুসরণ করা যাবে না এবং ঐ লোকেরও না, যে তার অনুসরণ করবে। কেননা, উভয়েরই হত্যার শিকার হবার আশংকা রয়েছে। যখন আল্লাহ্ তার নবী (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে ওফাত দিলেন, তখন আবূ বকর (রাঃ) ছিলেন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। অবশ্য আনসারগণ আমাদের বিরোধিতা করেছেন। তারা সকলে বানী সাঈদার চত্বরে মিলিত হয়েছেন।
আমাদের থেকে বিমুখ হয়ে 'আলী, যুবায়ব ও তাদের সাথীরাও বিরোধিতা করেছেন অপরদিকে মুহাজিরগণ আবূ বকরের কাছে সমবেত হলেন। তখন আমি আবূ বকরকে বললাম, হে আবূ বকর! আমাদেরকে নিয়ে আমাদের ঐ আনসার ভাইদের কাছে চলুন। আমরা তাদের উদ্দেশে রওনা হলাম। যখন আমরা তাদের নিকটবর্তী হলাম। তখন আমাদের সঙ্গে তাদের দুজন পূণ্যবান ব্যক্তির সাক্ষাৎ হল। তারা উভয়েই এ বিষয়ে আলোচনা করলেন, যে বিষয়ে লোকেরা ঐকমত্য করছিল। এরপর তারা বললেন, হে মুহাজির দল। আপনারা কোথায় যাচ্ছেন? তখন আমরা বললাম, আমরা আমাদের ঐ আনসার ভাইদের উদ্দেশে রওনা হয়েছি। তারা বললেন, আপনাদের তাদের নিকট না যাওয়াই উচিত। আপনারা আপনাদের বিষয় সমাপ্ত করে নিন। তখন বললাম, আল্লাহর কসম! আমরা অবশ্যই তাদের কাছে যাব। আমরা চললাম। অবশেষে বানী সাঈদার চত্বরে তাদের কাছে এলাম। আমরা দেখতে পেলাম তাদের মাঝখানে এক লোক বস্ত্রাবৃত অবস্থায় রয়েছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ঐ লোক কে? তারা জবাব দিল ইনি সা'দ ইবনু 'উবাদাহ। আমি জিজ্ঞেস করলা, তার কী হয়েছে? তারা বলল, তিনি জ্বরে আক্রান্ত। আমরা কিছুক্ষণ বসার পরই তাদের খতীব উঠে দাঁড়িয়ে কালিমায়ে শাহাদাত পড়লেন এবং আল্লাহ যথোপযুক্ত প্রশংসা করলেন।
তারপর বললেন, আম্মবাদ। আমরা আল্লাহর(দ্বীনের) সাহায্যকারী ও ইসলামের সেনাদল এবং তোমরা হে মুহাজির দল। একটি ছোট দল মাত্র, যে দলটি তোমাদের গোত্র থেকে আলাদা হয়ে আমাদের কাছে পৌঁছেছে। অথচ এরা এখন আমাদেরকে মূল থেকে সরিয়ে দিতে এবং খিলাফত থেকে বঞ্চিত করে দিতে চাচ্ছে। যখন তিনি নিশ্চুপ হলেন তখন আমি কিছু বলার ইচ্ছে করলাম। আর আমি আগে থেকেই কিছু কথা সাজিয়ে রেখেছিলাম, যা আমার কাছে ভাল লাগছিল। আমি ইচ্ছে করলাম যে, আবূ বকর (রাঃ) - এর সামনে কথাটি পেশ করব। আমি তার ভাষণ থেকে সৃষ্ট রাগকে কিছুটা ঠাণ্ডা করতে চাইলাম। আমি যখন কথা বলতে চাইলাম তখন আবু বকর (রাঃ) বললেন, তুমি থাম। আমি তাকে রাগান্বিত করাটা পছন্দ করলাম না। তাই আবু বকর (রাঃ) কথা বললেন, আর তিনি ছিলেন আমার চেয়ে সহনশীল ও গম্ভীর। আল্লাহর কসম! তিনি এমন কোন কথা বাদ দেননি যা আমি সাজিয়ে রেখেছিলাম। অথচ তিনি তাৎক্ষণিকভাবে এরকম বরং তার থেকেও উত্তম কথা বললেন। অবশেষে তিনি কথা বন্ধ করে দিলেন। এরপর আবার বললেন, তোমরা তোমাদের ব্যাপারে যেসব উত্তম কাজের কথা বলেছ আসলে তোমরা এর উপযুক্ত। তবে খিলাফাতের ব্যাপারটি কেবল এই কুরাইশ বংশের জন্য নির্দিষ্ট। তারা হচ্ছে বংশ ও আবাসভূমির দিক দিয়ে সর্বোত্তম আরব। আর আমি এ দু'জন হতে যে কোন একজনকে তোমাদের জন্য নির্ধারিত করলাম। তোমরা যে-কোন একজনের হাতে ইচ্ছা বায়'আত করে নাও। এরপর তিনি আমার ও আবূ 'উবাইহাদ ইবনু জাররাহ্ (রাঃ) - এর হাত ধরলেন। তিনি আমাদের মাঝখানেই বসা ছিলেন। আমি তাঁর এ কথা ব্যতীত যত কথা বলেছেন কোনটাকে অপছন্দ করিনি। আল্লাহর কসম! আবু বকর রা: যে জাতির মধ্যে বর্তমান আছেন সে জাতির উপর আমি শাসক নিযুক্ত হবার চেয়ে এটাই শ্রেয় যে, আমাকে পেশ করে আমার ঘাড় ভেঙ্গে দেয়া হবে, ফলে তা আমাকে কোন গুনাহের কাছে আর নিয়ে যেতে পারবে না। হে আল্লাহ! হয়ত আমার আত্মা আমার মৃত্যুর সময় এমন কিছু আকাঙ্খা করতে পারে, যা এখন আমি পাচ্ছি না। তখন আনসারদের এক ব্যক্তি বলে উঠল, আমি এ জাতির অভিজ্ঞ ও বংশগত সম্ভ্রান্ত। হে কুরাইশগণ! আমাদের হতে হবে এক আমীর আর তোমাদের হতে হবে এক আমীর। এ সময় অনেক কথা ও হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল। আমি এ মতবিরোধের দরুন শংকিত হয়ে পড়লাম।
তাই আমি বললাম, হে আবূ বকর! আপনি হাত বাড়ান। তিনি হাত বাড়ালেন। আমি তাঁর হাতে বায়'আত করলাম। মুহাজিরগণও তাঁর হাতে বায়'আত করলেন। অতঃপর আনসারগণও তাঁর হাতে বায়আত করলেন।
আর আমরা সা'দ ইবনু 'উবাদাহ (রাঃ) - এর দিকে এগোলাম। তখন তাদের এক লোক বলে উঠল, তোমরা সা'দ ইবনু 'উবাদাকে জানে মেরে ফেলেছ। তখন আমি বললাম, আল্লাহ্ সা'দ ইব্ ওবাদাকে হত্যা করেছেন। 'উমার (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা সে সময়ের জরুরী বিষয়ের মধ্যে আবূ বকরের বায়আতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন কিছুকে মনে করিনি। আমাদের ভয় ছিলে যে, যদি বায়আতের কাজ অসম্পন্ন থাকে, আর এ জাতি থেকে আলাদা হয়ে যাই তাহলে তারা আমাদের পরে তাদের কারো হাতে বায়আত করে নিতে পারে। তারপর হয়ত আমাদেরকে নিজ ইচ্ছার তখন আনসারদের এক ব্যাক্ত বলে ওঠল, আমি এ জাতের আভজ্ঞ ও বংশগত সম্ভ্রান্ত। হে কুরায়েশ গণ! আমাদের হতে হবে এক আমীর আর তোমাদের হতে হবে এক আমীর। এ সময় অনেক কথা ও হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল।
আমি এ মতবিরোধের দরুন শংকিত হয়ে পড়লাম। তাই আমি বললাম, হে আবূ বকর! আপনি হাত বাড়ান। তিনি হাত বাড়ালেন। আমি তাঁর হাতে বায়আত করলাম। মুহাজিরগণও তাঁর হাতে বায় আত করলেন। অতঃপর আনসারগণও তাঁর হাতে বায়আত করলেন। আর আমরা সা'দ ইবনু 'উবাদাহ (রাঃ) এর দিকে এগোলাম। তখন তাদের এক লোক বলে উঠল, তোমরা সা'দ ইবনু উবাদাকে জানে মেরে ফেলেছ। তখন আমি বললাম, আল্লাহ্ সা'দ ইবনু ওবাদাকে হত্যা করেছেন। 'উমার (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা সে সময়ের জরুরী বিষয়ের মধ্যে আবু বকরের (রা:) এর বায়আতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন কিছুকে মনে করিনি। আমাদের ভয় ছিল যে, যদি বায়আতের কাজ অসম্পন্ন থাকে, আর এ জাতি থেকে আলাদা হয়ে যাই তাহলে
তারা আমাদের পরে তাদের কারো হাতে বায়আত করে নিতে পারে। তারপর হয়ত আমাদেরকে নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের অনুসরণ করতে হত, না হয় তাদের বিরোধিতা করতে হত, ফলে তা মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াত। অতএব যে ব্যক্তি মুসলিমদের পরামর্শ ছাড়া কোন ব্যক্তির হাতে বায়আত করবে তার অনুসরণ করা যাবে না। আর ঐ লোকেরও না, যে তার অনুসরণ করবে। কেননা উভয়েরই নিহত হওয়ার
আশংকা আছে। [সহিহ বুখারী: ৪৩৫৯ ও ৬৮৩০]
হযরত আলী(রা:) এর বিরতি নেয়ার বুখারীর হাদীস।--->>>>
২)রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কন্যা ফাতিমা আবু বকরের কাছে (যখন তিনি খলিফা ছিলেন) একজনকে পাঠালেন, তাঁর কাছে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফয় (অর্থাৎ অর্জিত লুণ্ঠন) থেকে প্রদত্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকার চেয়েছিলেন। যুদ্ধ ছাড়াই) মদীনা এবং ফাদাকে এবং খায়বার লুটের খুমুসের যা অবশিষ্ট ছিল। তখন আবু বকর (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “আমাদের সম্পত্তি উত্তরাধিকারী নয়। আমরা যা ত্যাগ করি, তা সাদাকা, তবে (নবী) মুহাম্মদের পরিবার এই সম্পত্তি খেতে পারে।' আল্লাহর কসম, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সদকার অবস্থার কোন পরিবর্তন করব না এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবদ্দশায় যেমন ছিল তেমনি রেখে দেব এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেভাবে ব্যবহার করতেন সেভাবে তা নিষ্পত্তি করব। করতে হবে।" সুতরাং আবু বকর ফাতিমাকে এর কিছুই দিতে অস্বীকার করলেন। ফলে তিনি আবু বকরের প্রতি রাগান্বিত হলেন এবং তার থেকে দূরে সরে গেলেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাকে কোন দায়িত্ব দেননি। তিনি মারা যাওয়ার পর ছয় মাস জীবিত ছিলেন। যখন তিনি মারা যান, তখন তার স্বামী আলী আবু বকরকে না জানিয়েই তাকে দাফন করেন এবং ফাতিমা যখন জীবিত ছিলেন, তখন লোকেরা আলীকে অনেক সম্মান করত, আলী লক্ষ্য করেছিলেন তার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন তাই 'আলী আবু বকরের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য তাকে আনুগত্যের শপথ দিয়েছিলেন। আলী (রাঃ) আবু বকরের কাছে কাউকে পাঠালেন যে, "আমাদের কাছে এসো, কিন্তু কেউ যেন তোমার সাথে না আসে," তিনি পছন্দ করতেন না যে উমর আসবেন, উমর (আবু বকরকে) বললেন, "না, আল্লাহর কসম, তুমি প্রবেশ করবে না। তাদের উপর একা আবু বকর বললেন, "তারা আমার সাথে কি করবে বলে তোমার মনে হয়? আল্লাহর কসম, আমি তাদের কাছে যাব', তাই আবু বকর তাদের কাছে প্রবেশ করলেন, অতঃপর আলী তাশাহ-হুদ উচ্চারণ করলেন এবং বললেন (আবু বকরকে), "আমরা আপনার শ্রেষ্ঠত্ব এবং আল্লাহ আপনাকে যা দিয়েছেন তা ভাল করেই জানি, এবং আমরা হিংসা করি না। আল্লাহ আপনাকে যা দান করেছেন তার মধ্যে, কিন্তু আপনি শাসনের প্রশ্নে আমাদের সাথে পরামর্শ করেননি এবং আমরা ভেবেছিলাম যে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে আমাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে আমরা এতে অধিকার পেয়েছি।" তখন আবু বকরের চোখ বেয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয়। আর আবু বকর যখন কথা বললেন, তখন তিনি বললেন, “যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা আমার কাছে আমার নিকট আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সুসম্পর্ক রাখার চেয়ে প্রিয়। তার সম্পত্তি নিয়ে আমার ও তোমাদের মধ্যে যে বিরোধ দেখা দিয়েছে, আমি তা ভালোমতো ব্যয় করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব এবং আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে যে বিধি-বিধান অনুসরণ করতে দেখেছি, তার নিষ্পত্তি করতে আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করব। অনুসরণ করুন।" তখন আলী (রাঃ) আবু বকরকে বললেন, আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, দুপুরের পর আপনাকে বাইয়াত করব। তাই আবু বকর যখন যোহরের নামায পড়লেন, তখন তিনি মিম্বরে আরোহণ করলেন এবং তাশাহ-হুদ উচ্চারণ করলেন এবং তারপর আলীর ঘটনা এবং তাঁর আনুগত্যের শপথ গ্রহণে ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করলেন এবং তিনি যে অজুহাত পেশ করেছিলেন তা মেনে নিয়ে তাকে ক্ষমা করলেন; অতঃপর আলী (উঠে) এবং (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করে, তিনি তাশাহ-হুদ উচ্চারণ করলেন, আবু বকরের হকের প্রশংসা করলেন এবং বললেন, তিনি যা করেছিলেন তা তিনি আবু বকরের প্রতি ঈর্ষার কারণে করেননি বা তার প্রতিবাদ হিসেবে করেননি। যে আল্লাহ তাকে অনুগ্রহ করেছেন। 'আলী যোগ করেছেন, "কিন্তু আমরা মনে করতাম যে আমাদেরও এই বিষয়ে (শাসনের) কিছু অধিকার আছে এবং তিনি (অর্থাৎ আবু বকর) এই বিষয়ে আমাদের সাথে পরামর্শ করেননি, এবং তাই আমাদের দুঃখিত করেছেন।" এতে সকল মুসলমান খুশি হয়ে বললেন, আপনি ঠিকই করেছেন। মুসলমানরা তখন আলীর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ তিনি লোকেদের যা করেছিলেন (অর্থাৎ আবু বকরের আনুগত্যের শপথ করা) সেদিকে ফিরে আসেন।(সহিহ বুখারী:৪২৪০-৪২৪১, সহিহ মুসলিম:৪৫৮০)
নবিজী সা: এর ভবিষ্যতবানী:-
৩)আবূ বুরদাহ (রাঃ) এর পিতা সানাদ থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন আমরা বললাম, আমরা যদি তাঁর সাথে ইশার সালাত আদায় করা পর্যন্ত উপবিষ্ট হতে পারতাম (তা হলে কতই না ভালো হতো)। রাবী বলেন, আমরা বসে থাকলাম। তখন রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নিকট আসলেন। তারপর তিনি বললেনঃ তোমরা এখনো পর্যন্ত এখানে উপবিষ্ট আছ? আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল আমরা আপনার সাথে মাগরিবের সলাত আদায় করেছি। তারপর আমরা বললাম যে ইশার সলাত আপনার সাথে আদায় করার জন্য বসে অপেক্ষা করি। তিনি বললেনঃ তোমরা অনেক ভাল করেছ কিংবা তোমরা ঠিক করেছ। তিনি (রাবী) বলেন, তারপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আকাশের দিকে মাথা তুললেন এবং তিনি অধিকাংশ সময়ই আকাশের পানে তাঁর মাথা তুলতেন। অতঃপর তিনি বললেন তারকারাজি অবস্থানের কারণেই আকাশ স্থিতিশীল রয়েছে। তারকারাজি যখন বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে তখন আকাশের জন্য ওয়াদাকৃত বিপদ আসন্ন হবে (অর্থ্যাৎ- কিয়ামাত এসে যাবে এবং আসমান ফেটে চৌচির হয়ে যাবে)। আর আমি আমার সাহাবাদের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা স্বরূপ। আমি যখন বিদায় নিব তখন আমার সাহাবাদের উপর ওয়া'দাকৃত
সময় এসে সমুপস্থিত হয়ে যাবে (অর্থাৎ ফিতনা-ফাসাদ ও দ্বন্দ সংঘাত লেগে যাবে)। আর আমার সাহাবাগণ সকল উন্মাতের জন্য রক্ষাকবচ স্বরুপ। আমার সাহাবীগণ যখন বিদায় হয়ে যাবে তখন আমার উম্মাতের উপর ওয়া'দাকৃত বিষয় উপস্থিত হবে। [সহিহ মুসলিম: ৬৪৬৬]
৪)-সাঈদ ইবনু জুহমান (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, সাফিনাহ (রাঃ) আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আমার উম্মতের খিলাফাতের সময়কাল (শাসনকাল ) হবে ত্রিশবছর, তারপর হবে রাজতন্ত্র। তারপর সাফিনাহ (রাঃ) আমাকে বললেন, তুমি আবূ বকর (রাঃ) এর খিলাফতকাল গণনা কর। তারপর বললেন, উমার ও উসমান (রাঃ)-এর খিলাফতকাল গণনা কর। তারপর বললেন, আলী (রাঃ)-এর খিলাফতকালও গণনা কর। আমরা গণনা করে এর সময়কাল ত্রিশবছরই পেলাম। সাঈদ (রাঃ) বললেন, আমি তাকে বললাম বানু উমাইয়ার জনগণ ও দাবি করে যে, তাদের মাঝে ও খেলাফাত বিদ্যমান? তিনি বললেন যারকার সন্তানেরা মিথ্যা বলছে, বরং তারা তো নিকৃষ্ট রাজতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত রাজতান্ত্রিক গোষ্ঠী।
মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায়ঃ নু'মান বিন বশীর (র) আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর গোপন বিষয়ের জ্ঞানধারণকারী হুযাইফা(র) হতে বর্ণনা করেন, আমি আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু "আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে শাসকদের সম্পর্কে হাদিস মুখস্থ রেখেছি। তিনি বলেন: “নবুওয়্যাত তোমাদের মাঝে থাকবে, যতদিন মহান আল্লাহ চান, এরপর তিনি তা উঠিয়ে নেবেন যখন তিনি চান। অতপর, নবুওয়্যাতের আদলে খিলাফাহ আসবে এবং তা বিদ্যমান থাকবে যতদিন তিনি চান এবং তিনি উঠিয়ে নেবেন যখন তিনি চান। অতঃপর আসবে উত্তরাধিকার সূত্রে রাজতন্ত্র এবং তা থাকবে যতদিন মহান আল্লাহ চান এবং তিনি তা উঠিয়ে নেবেন যখন চান। অতঃপর আসবে চরম জবরদস্তির শাসন, যা থাকবে যতদিন মহান আল্লাহ চান এবং যখন তিনি চান, তা উঠিয়ে নেবেন। অতঃপর আসবে নবুওয়াতে আদলে খিলাফাহ। এর পর তিনি চুপ হয়ে গেলেন। তিরমিজীর বর্ণনায়ঃ সাফীনাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ "আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ নবুওয়্যাতের ভিত্তিতে পরিচালিত খিলাফত ত্রিশ বছর অব্যাহত থাকবে। অতঃপর আল্লাহর যাকে ইচ্ছা রাজত্ব বা তাঁর রাজত্ব দান করবেন। সাঈদ (রহঃ) বলেন, আমাকে সাকীনাহ (রাঃ) বলেছেন, হিসেব করো, আবূ বকর (রাঃ) দুই বছর, "উমার (রাঃ) দশ বছর, উসমান (রাঃ) বারো বছর ও আলী (রাঃ) এতো বছর খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেছেন। সাঈদ (রহঃ) বলেন, আমি সাফীনাহ (রাঃ) - কে বললাম, এরা ধারণা করে যে, 'আলী (রাঃ) খলীফাহ ছিলেন না। তিনি বলেন, বর্নী যারকা অর্থাৎ মাওয়ানের বংশধরগণ মিথ্যা বলেছে। [আবু দাউদ: ৪৬৪৬, জামে আত-তিরমিজি, মুসনাদে আহমাদ ১৮৪৩০ (৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা ২৭৩): ২২২৬, মিশকাতুল মাসাবিহ ৫৩৭৮, শায়খ যুবাইর আলি যাই এবং শায়খ শুআইব আরনাউৎ বলেন: এর সনদ সহীহ]

Comments
Post a Comment